بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِِ

মুমিনদের আধ্যাত্মিক খোরাক

শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ – নিষ্ঠাবান বদরী সাহাবীগণ: হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

আহ্‌মদীয়া মুসলিম জামা’তের বিশ্ব-প্রধান ও পঞ্চম খলীফাতুল মসীহ্‌, আমীরুল মু’মিনীন হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) গত ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ইং ইসলামাবাদের মসজিদে মুবারকে প্রদত্ত জুমুআর খুতবায় সাম্প্রতিক ধারা অনুসরণে নিষ্ঠাবান বদরী সাহাবীদের বর্ণাঢ্য জীবনের স্মৃতিচারণ করেন। এ খুতবায় হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)’র খিলাফতকালে বিভিন্ন অঞ্চলে অর্জিত বিজয়াভিযান সম্পর্কে আলোকপাত করেন। খুতবার শেষাংশে হুযূর (আই.) সম্প্রতি প্রয়াত কতিপয় নিষ্ঠাবান আহমদীর স্মৃতিচারণ করেন ও নামাযান্তে তাদের গায়েবানা জানাযা পড়ান।

তাশাহ্‌হুদ, তাআ’ঊয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর (আই.) বলেন, হযরত উমর (রা.)’র যুগের ঘটনাবলীর স্মৃতিচারণ হচ্ছে; এর ধারাবাহিকতায় আজ বায়তুল মাকদাস জয়ের ঘটনা বর্ণনা করা হবে যা ১৫ হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিল। হযরত আমর বিন আস (রা.)’র নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী বায়তুল মাকদাস বা জেরুজালেম অবরোধ করে, পরবর্তীতে হযরত আবু উবায়দাহ্ (রা.)’র বাহিনীও তাদের সাথে যোগ দেয়। দুর্গে আবদ্ধ থাকতে থাকতে খ্রিস্টানরা হাঁপিয়ে ওঠে এবং সন্ধির প্রস্তাব দেয়, তবে সেইসাথে শর্ত জুড়ে দেয় যে, হযরত উমর (রা.) স্বয়ং এসে যেন সন্ধিচুক্তি করেন। হযরত উমর (রা.) সাহাবীদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলে হযরত আলী (রা.) তাঁকে সেখানে যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং হযরত উমর (রা.) তা গ্রহণ করেন। যদিও এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল শত্রুদের সামনে ইসলামের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রদর্শন, কিন্তু হযরত উমর (রা.) অত্যন্ত সাদামাটা ভাবে যাত্রা করেন; তাঁর বাহন ছিল একটি ঘোড়া আর সাথে ছিলেন কয়েকজন মুহাজির ও আনসার সাহাবী। এমন বর্ণনাও পাওয়া যায় যে, তাঁর সঙ্গী ছিলেন একজন ক্রীতদাস ও পাথেয় ছিল সামান্য ছাতু, আর তাঁর বাহন ছিল একটি উট। তবুও যেখানেই এই খবর পৌঁছাতো যে, হযরত উমর (রা.) মদীনা থেকে জেরুজালেমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন, তাঁর প্রতাপে মাটি কেঁপে উঠতো। প্রাসঙ্গিকভাবে হুযূর (আই.) বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা তুলে ধরেন যে, হযরত উমর (রা.) কার আহ্বানে ও কোন প্রেক্ষাপটে জেরুজালেম অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। তাবারী, ইবনে আসীর, ইবনে কাসীর প্রমুখদের বর্ণনা বিশ্লেষণ করে মুহাম্মদ হোসেন হ্যায়কল এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, হযরত আমর বিন আস (রা.)’র পত্রের প্রেক্ষিতে হযরত উমর (রা.) পূর্বেই সাহায্যকারী সৈন্যদল নিয়ে মদীনা থেকে জেরুজালেম অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন, পথিমধ্যে তিনি জাবীয়া নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন ও মুসলিম সেনাধ্যক্ষদের সাথে আলোচনায় বসতে মনস্থ করেন। জাবীয়া পৌঁছে তিনি জানতে পারেন, খ্রিস্টানরা তাঁর উপস্থিতিতে সন্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। এই সফরে হযরত উমর (রা.)’র সফরসঙ্গীদের মধ্যে হযরত আব্বাস-ও ছিলেন। সফরের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিদিন হযরত উমর (রা.) ফজরের নামাযের পর সবার উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ বক্তব্য প্রদান করতেন; তিনি আল্লাহ্ তা’লার গুণকীর্তন ও দরূদ পাঠের পর বলতেন যে, কীভাবে ইসলামের মাধ্যমে দ্বিধাবিভক্ত আরবরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে ও তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়েছে; আর তাদেরকে আল্লাহ্ তা’লার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ও দোয়ার প্রতি অবিচল থাকতে উপদেশ দিতেন যেন তারা আরও অধিক কল্যাণ ও কৃপা লাভ করতে পারে।

জাবীয়াতে মুসলিম সেনাধ্যক্ষরা হযরত উমর (রা.)’র সাথে যখন সাক্ষাৎ করতে আসেন তখন তাদের পরনে ছিল চোখ-ধাঁধানো মূল্যবান পোশাক-আশাক, যা দেখে হযরত উমর (রা.) খুবই অসন্তুষ্ট হন। মুসলিম নেতৃবৃন্দ নিবেদন করেন, এরূপ বেশ-ভূষা তারা কেবলমাত্র ইসলামের মর্যাদা প্রকাশের নিমিত্তে করেছেন, নতুবা এই পোশাকের নিচেই তারা বর্ম ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। হযরত উমর (রা.) বলেন, এটি যদি প্রকৃত উদ্দেশ্য হয়ে থাকে এবং তারা তাদের শিক্ষা ও আদর্শ ভুলে না গিয়ে থাকেন, তবে ঠিক আছে। তারা আমীরুল মু’মিনীনকেও অনুরোধ করেন যেন তিনিও ইসলামের মর্যাদা ও প্রতাপ প্রদর্শনার্থে উন্নত মানের পোশাক পরিধান করেন, কিন্তু হযরত উমর (রা.) তাঁর দুই প্রাণপ্রিয় সাথী- মহানবী (সা.) ও হযরত আবু বকর (রা.)’র উল্লেখ করে বলেন, তিনি চান- তাঁদের মতই অনাড়ম্বরভাবে তাঁর জীবনাবসান হোক।

অনন্তর জাবীয়াতেই মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্যে সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হয়, যা হুযূর (আই.) নাতিদীর্ঘ বর্ণনায় তুলে ধরেন। ইলিয়া শহর, যেখানে বায়তুল মাকদাস অবস্থিত ছিল, সেখানকার একটি প্রতিনিধিদল হযরত উমর (রা.)’র সাথে সন্ধিচুক্তি করতে আসে। চুক্তিপত্রে হযরত উমর (রা.) উল্লেখ করে দেন, খ্রিস্টানদের প্রাণ, সম্পদ, গির্জা-ক্রুশ ইত্যাদি সবই নিরাপদ থাকবে; যারা রোমানদের সাথে চলে যেতে চায় তারা নিরাপদে চলে যেতে পারে, আর যারা জিযিয়া বা কর দিয়ে এখানে থাকতে চায় তারাও এখানে নিরাপদে থাকতে পারে। প্রাসঙ্গিকভাবে হুযূর (আই.) প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ইবনে খালদূনের একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরেন যেখানে তিনি এই সন্ধিচুক্তি থেকে বিশেষভাবে তিনটি বিষয় সাব্যস্ত হওয়ার কথা লিখেছেন; প্রথমতঃ ইসলাম তরবারির জোরে বিস্তার লাভ করে নি, দ্বিতীয়তঃ মুসলিম শাসনের অধীনে অন্য ধর্মাবলম্বীরা অসাধারণ ধর্মীয় স্বাধীনতা পেতো, তৃতীয়তঃ ভিনজাতির ওপর জিযিয়া বা কর চাপিয়ে দেয়া হতো না, বরং তারা স্বেচ্ছায় জিযিয়া দিয়ে থাকতে পারতো কিংবা নিরাপদে অন্যত্র চলে যেতে পারতো। এগুলো ইসলামের অনন্য উদার মনোভাবের পরিচায়ক। ইলিয়াবাসীদের এরূপ সন্ধিচুক্তি সম্পর্কে জানার পর রামাল্লা, লুদ ও ফিলিস্তিনের অন্যান্য শহরের বাসিন্দারাও খলীফার সাথে অনুরূপ সন্ধিচুক্তি করে। হযরত উমর (রা.) ইলিয়া অঞ্চলে আলকামা বিন মুজায্যিয এবং রামাল্লা অঞ্চলে আলকামা বিন হাকীমকে শাসক নিযুক্ত করেন। এসব দায়িত্ব পালনের পর হযরত উমর (রা.) বায়তুল মাকদাস পরিদর্শনে যান; খ্রিস্টান পাদ্রীরা তাঁর কাছে শহরের চাবি হস্তান্তর করে। তিনি মসজিদুল আকসা ও খ্রিস্টানদের জাঁকজমকপূর্ণ গির্জা পরিদর্শন করেন। ইতোমধ্যে নামাযের সময় হলে খ্রিস্টানরা তাঁকে গির্জাতেই নামায পড়তে অনুরোধ করে; কিন্তু হযরত উমর (রা.) তা করেন নি, বরং বেরিয়ে এসে অন্যত্র নামায পড়েন। তিনি এটি এজন্য করেছিলেন যেন ভবিষ্যতে মুসলমানরা সেটিকে নিজেদের ঐতিহাসিক স্থান মনে করে তা আবার দখল করে না বসে। এটিও হযরত উমর (রা.)’র পরম দূরদর্শীতা ও উদার মানসিকতার পরিচায়ক।

মুসলিম সেনাধ্যক্ষরা অনেকেই যেমন স্বাচ্ছন্দ্য অবলম্বন করতেন, তেমনিভাবে অনেকেই কাঠিন্যের জীবনও অবলম্বন করতেন। প্রধান সেনাপতি হযরত আবু উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ্ (রা.) তেমনই এক ব্যক্তি ছিলেন। ঘটনাচক্রে একদিন যখন হযরত উমর (রা.) তার বাড়িতে যান তখন দেখতে পান, তার বাড়িতে কোন আসবাবপত্র নেই; ঘোড়ার পিঠে চাপানোর কাপড়টিই তার বিছানা এবং ঘোড়ার জিন ছিল তার বালিশ। তার এরূপ অনাড়ম্বর জীবন দেখে হযরত উমর (রা.) অশ্রু সংবরণ করতে পারেন নি; তিনি তাকে জড়িয়ে ধরেন ও তাকে নিজের ভাই বলে সম্বোধন করেন।

ইলিয়াতে অবস্থানকালে একদিন হযরত বেলাল (রা.) খলীফার কাছে অভিযোগ করেন যে, সেনাধ্যক্ষরা পাখির মাংস, ময়দার রুটি ইত্যাদি উন্নত খাবার খান, অথচ সাধারণ মুসলমানদের খাবার অত্যন্ত মামুলি বা সাদামাটা। হযরত উমর (রা.) খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, এসব উন্নত খাবার সেখানে সস্তায় পাওয়া যায়, সেনাধ্যক্ষরা এর জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করেন না। তাই তিনি বায়তুল মাল থেকে রেশন আকারে সৈনিকদের জন্যও উন্নত খাবারের বন্দোবস্ত করে দেন। ইলিয়াতে অবস্থানকালেই একদিন মুসলমানগণ খলীফার কাছে গিয়ে আবেদন করেন যে, হযরত বেলাল (রা.) যেন আযান দেন। হযরত বেলাল (রা.) মহানবী (সা.)-এর তিরোধানের পর আযান দেয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু খলীফার আহ্বানে তিনি সেদিন আযান দেন এবং সবার চোখে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র যুগ ভেসে ওঠে আর সবাই আবেগপ্রবণ হয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন এবং হযরত বেলাল (রা.) আবেগে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। এখানে যাবতীয় কর্ম সম্পাদনের পর হযরত উমর (রা.) মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

১৭ হিজরীতে রোমানদের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিন উদ্ধারে একবার শেষচেষ্টা করা হয়, যার পরিণতিতে সেদেশে মুসলমানদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। হুযূর (আই.) এই ইতিহাসের নাতিদীর্ঘ বর্ণনা তুলে ধরেন। ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী স্থান জাযিরার অধিবাসী খ্রিস্টানরা হিরাক্লিয়াসের কাছে নৌপথে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করতে আবেদন জানায়। হিরাক্লিয়াস তাদের প্রস্তাবে সম্মত হয়, কারণ তার ধারণা ছিল যে, এভাবে তারা জয়ী হতে পারবে। হযরত আবু উবায়দাহ্ (রা.) যখন তাদের গতিবিধি সম্পর্কে জানতে পারেন তখন হযরত খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা.)-কে পরামর্শ করার জন্য কিনেসরিন থেকে ডেকে পাঠান। হিরাক্লিয়াসের নৌবাহিনী আন্তাকিয়া অভিমুখে রওয়ানা হয়, ওদিকে জাযিরার ত্রিশ হাজার সেনা হিমস অভিমুখে যাত্রা করে। হিরাক্লিয়াসের নৌবাহিনী আন্তাকিয়া এলে সেখানকার অধিবাসীরা মুসলমানদের সাথে চুক্তিভঙ্গ করে তাদের সাথে হাত মেলায় ও তাদের জন্য শহর উন্মুক্ত করে দেয়। আবু উবায়দাহ্ (রা.) পুরো বৃত্তান্ত হযরত উমর (রা.)-কে অবগত করেন। বাহ্যত শত্রুদের বিশাল বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে জেতা মুসলমানদের জন্য সম্ভবপর ছিল না, কিন্তু হযরত উমর (রা.) তখন নিজের অসাধারণ দূরদৃষ্টি এবং সুনিপুণ রণকৌশলের পরিচয় দেন, যা শত্রুদের হতভম্ব করে দেয়। তিনি হযরত সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস (রা.)-কে নির্দেশ দেন যেন হযরত কা’কার নেতৃত্বে চার হাজার সৈন্য হিমস অভিমুখে প্রেরণ করা হয়। ওদিকে আরেকটি সৈন্যদল তিনি জাযিরায় প্রেরণ করতে বলেন। জাযিরাবাসী যখন দেখে- মুসলমানরা তো আমাদের বাড়িতে গিয়ে চড়াও হচ্ছে, তখন তারা দ্রুত রণে ভঙ্গ দিয়ে নিজেদের বাড়িঘর বাঁচাতে ছুটে যায়; হিরাক্লিয়াসের নৌবাহিনীও পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এভাবে হযরত উমর (রা.)’র সুনিপুণ রণকৌশলে বাহ্যত নিশ্চিত পরাজয় মুসলমানদের জন্য এক মহান বিজয়ে পরিণত হয়; পরবর্তীতে ২০ হিজরীতে হিরাক্লিয়াস নিজেও মারা যায়। হুযূর (আই.) বলেন, এই স্মৃতিচারণ আগামীতেও অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ্।

খুতবার শেষদিকে হুযূর (আই.) কয়েকজন প্রয়াত নিষ্ঠাবান আহমদীর সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ করেন এবং তাদের গায়েবানা জানাযা পড়ানোর ঘোষণা দেন। তারা হলেন যথাক্রমে, কানাডা-প্রবাসী শ্রদ্ধেয় চৌধুরী সাঈদ আহমদ লক্ষন সাহেব, বাংলাদেশের প্রাক্তন নায়েব ন্যাশনাল আমীর শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ শাহাবুদ্দীন সাহেব ও আর্জেন্টিনার প্রথমদিকের আহমদী শ্রদ্ধেয় রাউল আব্দুল্লাহ্ সাহেব। হুযূর (আই.) তাদের রূহের মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করেন আর তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের ধৈর্য ও দৃঢ়মনোবলের জন্য দোয়া করেন।

ডাউনলোড করুন