بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِِ
১৯ এপ্রিল, ২০১৯
শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ – নিষ্ঠাবান বদরী সাহাবীগণ
মসজিদ বাইতুল ফুতুহ্, লন্ডন, যুক্তরাজ্য
  • সারমর্ম
    এই জুমু’আর খুতবার সারাংশটিতে কোনো প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে তার দায়ভার আহ্‌মদীয়া বাংলা টীম গ্রহণ করছে।

    আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের বিশ্ব-প্রধান ও পঞ্চম খলীফাতুল মসীহ্‌ হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) গত ১৯শে এপ্রিল, ২০১৯ লন্ডনের বায়তুল ফুতুহ মসজিদে প্রদত্ত জুমুআর খুতবায় পূর্বের ধারা অনুসরণে নিষ্ঠাবান বদরী সাহাবীদের বর্ণাঢ্য জীবনের স্মৃতিচারণ করেন। এ খুতবায় তিনি হযরত উসমান বিন মাযউন (রা.)’র জীবনের স্মৃতিচারণ করেন।

    হুযূর (আই.) বলেন, হযরত উসমান বিন মাযউন (রা.)’র ডাকনাম ছিল আবু সায়েব। তার মায়ের নাম ছিল সুখাইলা বিনতে আমবাস। তার ও তার ভাই হযরত কুদামার চেহারা অনেকটা একই রকম ছিল। তিনি কুরায়শদের বনু জামাহ গোত্রের লোক ছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি ইসলাম-গ্রহণকারী ১৪তম ব্যক্তি ছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটিও খুব চমকপ্রদ। একদিন তিনি মহানবী (সা.)-এর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন, মহানবী (সা.) তাকে বসতে বলেন। তিনি (সা.) তার সাথে কথা বলছিলেন, হঠাৎ তাঁর (সা.) দৃষ্টি আকাশ পানে নিবদ্ধ হয় এবং তিনি কিছু একটা অনুসরণ করতে থাকেন, যেন কেউ এসে তাঁর (সা.) পাশে আসন গ্রহণ করে। এরপর তিনি (সা.) মাথা নাড়াতে থাকেন, যেন কারও কথা শুনছেন; অতঃপর ঠিক আগের মতই তাঁর দৃষ্টি ধীরে ধীরে কারও চলে যাবার পানে যায়। উসমান বিন মাযউন অবাক হয়ে সবকিছু দেখতে থাকে আর পরে মহানবী (সা.)-এর কাছে এসবের অর্থ জানতে চান, তখন মহানবী (সা.) তাকে জানান যে, আল্লাহ্‌র কাছ থেকে দূত এসেছিলেন। উসমান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, তিনি এসে কী বললেন? মহানবী (সা.) তখন নাযিল হওয়া সূরা নাহলের ৯১ নাম্বার আয়াতটি পাঠ করে শোনান, যার অর্থ হল- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদেরকে ন্যায় প্রতিষ্ঠার, অনুগ্রহসুলভ আচরণের ও পরমাত্মীয়সুলভ দানশীলতার আদেশ দেন এবং অশ্লীলতা, প্রকাশ্য দুষ্কর্ম ও বিদ্রোহ করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যেন তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পার।”

    পবিত্র কুরআনের এই অসাধারণ বাণী শুনে হযরত উসমানের মনে ঈমান প্রোথিত হয়ে যায় আর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি খুবই সম্ভ্রান্ত বংশের ছিলেন, নিজ কর্মগুণে কুরায়শদের মধ্যে অনেক সম্মানিত আর যোগ্য বলেও বিবেচিত হতেন। হযরত আবু বকর, উমর, উসমান বিন আফফান, তালহা, যুবায়ের, উসমান বিন মাযউন প্রমুখ ব্যক্তিগণ ইসলাম গ্রহণ করায় ইসলাম একপ্রকার দৃঢ়তা লাভ করেছিল; কেননা তাঁরা মক্কার শিক্ষিত, বিচক্ষণ ও ভদ্রলোক বলে গণ্য হতেন। যদিও মুসলমানদের ওপর অত্যাচার চলছিল, কিন্তু কাফিররা মহানবী (সা.)-কে পাগল বলে উড়িয়ে দিতে পারত না। কেউ কাউকে এমনটি বললে সে পাল্টা প্রশ্ন করত- তাহলে অমুক অমুক কেন তাকে মানে? ইসলাম-বিদ্বেষী ইউরোপীয়ান সাহিত্যিকরা মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই কথা বলে, কিন্তু হযরত আবু বকর (রা.)-এর ব্যাপারে অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করে যে, তিনি একদম নিঃস্বার্থ মানুষ ছিলেন। ফলে অন্যরা স্বভাবতঃই প্রশ্ন তোলে, তাহলে যাকে আবু বকর মেনেছেন, তিনি (সা.) কীভাবে মিথ্যাবাদী বা লোভী হতে পারেন? এমনটিই হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বেলাতেও ঘটেছে; আল্লাহ্ তা’লা ঈমানদার, জ্ঞানী-গুণী ও সম্পদশালী অনুসারী তাঁকেও দান করেন, যেমনটি মহানবী (সা.) লাভ করেছিলেন।

    হযরত উসমান বিন মাযউন ইথিওপিয়ায় হিজরতকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি ও তার পুত্র সায়েব একদল মুসলমানের সাথে ইথিওপিয়ায় হিজরত করেন, পরবর্তীতে যখন এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মক্কার কুরায়শরা সবাই মুসলমান হয়ে গেছে তখন তিনি মক্কায় ফেরত আসেন। মক্কার কাছাকাছি আসার পর আসল ঘটনা জানতে পারেন, কিন্তু ইথিওপিয়া ফিরে যাওয়া তখন কষ্টকর ছিল। কিছুদিন সেখানে অপেক্ষার পর তিনি তার পিতার বন্ধু ওয়ালিদ বিন মুগীরার নিরাপত্তায় মক্কায় ফিরে আসেন। ওয়ালিদ বিন মুগীরা তাকে নিরাপত্তা দেয়ায় কাফিররা তার ওপর কোন অত্যাচার করতে পারছিল না, কিন্তু এটা হযরত উসমানের সহ্য হয়নি। তিনি এটি মানতেই পারছিলেন না যে, অন্য মুসলমানরা, এমনকি মহানবী (সা.)-ও কাফিরদের নির্যাতন ভোগ করবেন আর তিনি নিরাপদে থাকবেন, কিংবা আল্লাহ্ ছাড়া কোন মানুষের নিরাপত্তা তিনি গ্রহণ করবেন। তাই তিনি ওয়ালিদকে তার নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেন। এর কয়েকদিন পর কাবার প্রাঙ্গণে তিনি বিখ্যাত কবি লবীদ বিন রবীআর কবিতা শুনছিলেন, লবীদ একটি পংক্তি পড়ে যার অর্থ ছিল- “সব নিয়ামতই একসময় ফুরিয়ে যাবে”; এটি শুনে হযরত উসমান বলে বসেন- তুমি ভুল বলছ, জান্নাতের নিয়ামত চিরন্তন। লবীদ এটিকে তার কবিতার অমর্যাদা মনে করে উত্তেজিত হয়ে ওঠে, আর একজন মুশরিক হযরত উসমানের চোখে ঘুসি মেরে চোখ ফুলিয়ে দেয়। ওয়ালিদ বিন মুগীরা, যে উসমানের পিতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল, সে দুঃখ প্রকাশ করে বলে, তুমি যদি আজ আমার নিরাপত্তায় থাকতে তবে তোমার চোখের এই দশা হতো না। উসমান (রা.) বলেন, আমি তো উল্টো আনন্দিত হয়েছি, বরং আমার দুঃখ হচ্ছে, আমার অপর চোখেরও কেন একই অবস্থা হল না! একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া আর কারও নিরাপত্তার আমার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই।

    মহানবী (সা.) তাকে কতটা ভালোবাসতেন তা বোঝা যায় যখন তিনি ইন্তেকাল করেন তখন মহানবী (সা.) তাকে চুমু খান আর তাঁর (সা.) চোখ ছিল তখন অশ্রুসিক্ত; আবার যখন সাহেবযাদা ইবরাহীমের মৃত্যু হয় তখনও তিনি (সা.) বলেছিলেন- “আমাদের পুণ্যবান প্রিয়জন উসমান বিন মাযউনের সান্নিধ্যে যাও!”

    হযরত উসমান বিন মাযউন নিজের দু’ভাই হযরত কুদামা ও আব্দুল্লাহ্ এবং পুত্র সায়েব বিন উসমানের সাথে মদীনায় হিজরত করেন, পথিমধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন সালামা আজলানীর গৃহে অবস্থান করেছিলেন। মহানবী (সা.) তার ও হযরত আবুল হাইসাম বিন তায়্যিহান-এর মাঝে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন রচনা করেছিলেন। মদীনায় আসার পর তিনি বদরের যুদ্ধেও অংশ নেন। তিনি খুব উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে ইবাদত-বন্দেগীতে মগ্ন থাকতেন, দিনভর রোযা রাখতেন ও রাতভর নামায পড়তেন, প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা থেকে দূরে থাকতেন, এমনকি নিজের স্ত্রী’কেও এড়িয়ে চলতেন। তিনি মহানবী (সা.)-এর কাছে সন্ন্যাসী ও খোজা হয়ে যাবার জন্য অনুমতি চান, কিন্তু মহানবী (সা.) তা সোজা নাকচ করে দেন। একবার তার স্ত্রী উম্মুল মুমিনীনদের কাছে আসেন, তার অগোছালো ও শ্রীহীন চেহারা দেখে উম্মুল মুমিনীগণ তাকে তিরস্কার করেন ও নিজের চেহারা ও পোশাক-আশাকের যত্ন নিতে বলেন। কিন্তু হযরত উসমানের স্ত্রী মনমরা হয়ে উত্তর দেন, আমার দিকে তাকানোর তো তার কোন সময়ই নেই; সারাদিন রোযা রাখেন, রাতভর নামাযে মগ্ন থাকেন। মহানবী (সা.) যখন এটি জানতে পারেন তখন উসমানকে বলেন, আমার আদর্শ কি তোমার পছন্দ নয়? আমি তো নামাযও পড়ি আবার নিদ্রাও যাপন করি, রোযা রাখিও আবার ছেড়েও দিই, আমার স্ত্রীও আছে। হে উসমান, আল্লাহ্‌কে ভয় কর! তোমার ওপর তোমার স্ত্রী’র অধিকার আছে, তোমার পরিবারের অধিকার আছে, তোমার আত্মারও তোমার ওপর অধিকার আছে। হযরত উসমান বিন মাযউন এরপর থেকে এই নির্দেশই মেনে চলেছেন।

    হযরত উসমান বিন মাযউন (রা.) মদীনায় মৃত্যুবরণকারী প্রথম মুহাজির ছিলেন। তিনি ২য় হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন, তবে কোন কোন বর্ণনানুসারে তিনি বদরের যুদ্ধের ২২ মাস পর মৃত্যুবরণ করেন। তিনিই জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত প্রথম ব্যক্তি ছিলেন। হুযূর (আই.) বলেন, তার সম্বন্ধে আরও কিছু বিবরণ রয়েছে যা পরবর্তীতে বর্ণনা করব, ইনশাআল্লাহ্।

  • পুর্নাঙ্গ অনুবাদ